দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অবকাঠামো, উদ্ভাবনী অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতের সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সরকারি সফরের দ্বিতীয় কর্মদিবসে দেশটির শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, কোরিয়া এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক (কেইএক্সআইএম), কোরিয়া ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন (কেআইসি), শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে শুধু উন্নয়ন অর্থায়ন নয়, বরং বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্প অংশীদারত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির ক্ষেত্রেও দক্ষিণ কোরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইডিসিএফ সহযোগিতা ও অগ্রাধিকার প্রকল্প
কোরিয়া এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের (কেইএক্সআইএম) চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী হোয়াং কিয়নের সঙ্গে বৈঠকে ২০২৩-২০২৭ মেয়াদের ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইডিসিএফ কাঠামোগত অর্থায়ন চুক্তি পর্যালোচনা করা হয়।
আলোচনায় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঢাকা এমআরটি লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুট, মতলব উত্তর-গজারিয়া সেতু এবং ২৬০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচের বিষয়টি উঠে আসে।
কেইএক্সআইএম জানায়, বর্তমানে ইডিসিএফের অগ্রাধিকারগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কোরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্প প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশ অবশিষ্ট ইডিসিএফ অর্থায়ন ব্যবহারে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রস্তাব করে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট অবকাঠামো এবং স্থিতিশীল সরবরাহব্যবস্থাকে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরে।
কৌশলগত অর্থনৈতিক সংলাপ
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় উপমন্ত্রী চ্যাং হুর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশ-কোরিয়া সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কৌশলগত পর্যায়ে নেওয়ার আহ্বান জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী।
আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নত উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় পরিচালিত ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইজিএনডি) উদ্যোগের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার চলমান কারিগরি সহায়তাকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি এ উদ্যোগের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নেও কোরিয়ার আরও বিস্তৃত অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
কোরীয় পক্ষ এআই, ডিজিটাল রূপান্তর, বিকল্প অর্থায়ন, ভবিষ্যৎ ইডিসিএফ সহযোগিতা এবং আইজিএনডি উদ্যোগে আরও সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করে।
কোরীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আকর্ষণ
কোরিয়া ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশনের (কেআইসি) সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক অন্যান্য খাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ আনার বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ সময় সম্ভাব্য ১ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাংলাদেশ সার্বভৌম তহবিলকে বিনিয়োগের একটি সম্ভাব্য মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া কোরীয় তহবিল ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে কেআইসির ইকুইটি বিনিয়োগের সঙ্গে কোরিয়া এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়ন যুক্ত করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হয়।
এআই ও ডিজিটাল রূপান্তরে সহযোগিতা
বাংলাদেশ-কোরিয়া সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে উঠে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআই ও ডিজিটাল রূপান্তরে কোরীয় সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিকল্পনার সামঞ্জস্য রয়েছে বলে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।
এলজি এআই রিসার্চের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির উপযোগী লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরিতে সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনা হয়। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদনশিল্প ও সরকারি সেবায় এআই প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়েও কথা হয়।
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এআই ও ডেটা সেন্টার হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রতিনিধিদল। অন্যদিকে ফিউরিওসাএআইয়ের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের উচ্চমূল্য সংযোজনকারী এআই ইকোসিস্টেম শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
কেইএক্সআইএমও অবকাঠামো প্রকল্পে এআই প্রযুক্তি যুক্ত করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে।
কোরীয় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ
জ্বালানি, এলএনজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, উন্নত উৎপাদনশিল্প, নগর উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) সম্ভাবনা নিয়ে কোরীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল।
স্যামসাং সিঅ্যান্ডটির সঙ্গে বৈঠকে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নগর উন্নয়ন, পর্যটন এবং পিপিপি প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়টি উঠে আসে। এর মধ্যে ছাদ ও বড় পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং নির্বাচিত নগর উন্নয়ন উদ্যোগও রয়েছে।
স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি শুধু প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ (ইপিসি) ঠিকাদারি থেকে বেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে। অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো নিয়ে কারিগরি আলোচনা চালিয়ে যেতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়।
ইয়ংওনের আয়োজনে কোরীয় বিনিয়োগবিষয়ক ব্যবসায়িক গোলটেবিল বৈঠকেও অংশ নেয় বাংলাদেশ। সেখানে হালকা প্রকৌশল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কোরীয় সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের স্থানীয় সরবরাহকারীদের যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বৃহত্তর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের পথে
আলোচনায় বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্ককে প্রচলিত উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুযোগের ভিত্তিতে আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে দুই পক্ষের আগ্রহ প্রতিফলিত হয়েছে।
কোরীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে তাদের আরও সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলোকে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প, বিনিয়োগ অংশীদারত্ব এবং উভয় দেশের জন্য লাভজনক উদ্যোগে রূপ দিতে পরবর্তী সময়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
এমজে